জন্ডিস রোগ লক্ষণ ও প্রতিকার

জন্ডিস রোগ লক্ষণ ও প্রতিকার

জন্ডিস রোগ লক্ষণ ও প্রতিকার

জন্ডিসের ভ্যাকসিন কেন দেবেন?

হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস বি দু’টি সংক্রামক রোগ। হেপাটাইটিস এ বা সাধারণ জন্ডিস সাধারনতঃ খাবার পানি বাইরের খোলা ও জীবানুযুক্ত খাবার আহার করলে এবং আক্রান- ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে অথবা আক্রান- ব্যক্তির ব্যবহার্য জিনিসপত্র ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস এ বা সাধারণ জন্ডিস সংক্রমিত হতে পারে। সাধারনত বিশ্রাম ও কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চললে হেপাটাইটিস এ ভালো হয়। হেপাটাইটিস এ জন্ডিসের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন। দু’টি ভ্যাকসিন দিয়ে হেপাটাইটিস এ রোধ করা যায়। আর এক ধরনের জন্ডিস হচ্ছে হেপাটাইটিস বি। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস থেকে এই রোগ সংক্রমিত হয়।

জীবানুযুক্ত ইনজেকশনের সূই ব্যবহার জীবানুযুক্ত রক্ত সঞ্চালন, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক এই রোগ সংক্রমনের প্রধান কারণ। এই রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন রয়েছে। ৪টি ভ্যাকসিন দিয়ে হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধ করা যায়। তবে ভ্যাকসিন দেয়ার ক্ষেত্রে সবচাইতে উন্নতমানের কার্যকর ভ্যাকসিন দিতে হবে, কমদামের অননুমোদিত ভ্যাকসিন দিবেন না।

জেনে নেবেন ভ্যাকসিন ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদিত কিনা। সব সময় মনে রাখবেন অনেক অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফা লাভের আশায় অকার্যকর কমদামী ভ্যাকসিন বাজারজাত করছে। এসব ভ্যাকসিন শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী হয় না।

শিশুর জন্ডিসঃ

জন্মের পর প্রত্যেক বাচ্চার জন্ডিস হয়। বাচ্চার যখন তিনদিন বয়স, তখনই এর শুরু। কখনো আবার দুদিনের মাথায়ও এটা হতে পারে। সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে এটা আপনা থেকেই ঠিক হয়ে যায়। এ ধরনের জন্ডিসের নাম ‘ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস’। সদ্যোজাত শিশুদের বিলিরুবিনের পরিমাণ খুব বেশি থাকে।

কেননা যকৃতের যে উৎসেচক বা এনজাইমগুলোর বিলিরুবিন নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেগুলো শিশুর জন্মের অব্যবহিত পরেই তাদের কাজ ঠিকমত শুরু করে উঠতে পারে না। এটাই হলে ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের কারণ।

ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিসঃ

বাচ্চাদের আরেক ধরনের জন্ডিস হলো ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস। মায়ের দুধে এমন একটা হরমোন থাকে, যা থেকে শিশুর শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা খুব বেশি হয়ে যায়। এ ধরনের জন্ডিস অনেক বাচ্চারই হতে দেখা গেছে। মাঝে-মধ্যে এক থেকে দু’মাস এটা থাকে। শিশু হাসপাতালে থাকার সময়ে এটা ধরা পড়লে অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রা ভায়োলেটরে’র নিচে তাকে রাখা হয়।

 অনেক সময় অবশ্য বাচ্চা বাড়ি চলে যাওয়ার পর এই জন্ডিস ধরা পড়ে। সেক্ষেত্রে সূর্যের আলোয় বাচ্চাকে শুইয়ে রাখতে বলা হয়। এ দুটি উপায়ে এ ধরনের জন্ডিসের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।

রেশাস ইনকমপ্যাটিবিলিটিঃ

বাচ্চাদের জন্ডিসের মধ্যে সবচেয়ে জটিল বোধহয় রেশাস ইনকমপ্যাটিবিলিটি। মায়ের ব্লাড গ্রুপের সঙ্গে শিশুর ব্লাড গ্রুপ না মিললে অনেক সময় এই জন্ডিস শিশুর দেহে দেখা দেয়। জন্মের দিন থেকেই বাচ্চার এই জন্ডিস হয় এবং সেদিন থেকেই এর চিকিৎসা শুরু হওয়া দরকার। গর্ভাবস্থায় আগে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেই কিন্তু বাচ্চা জন্মানোর আগেই বোঝা সম্ভব, তার এ ধরনের জন্ডিস হবে কিনা।

সেক্ষেত্রে চিকিৎসারই সুবিধা হয়। এমনিতে এই জন্ডিস কমের মধ্যে থাকলে ফোটোথেরাপি দিয়েই সারানো সম্ভব। তা না হলে জন্ডিসের তীব্রতা খুব বেশি হলে শেষ বিকল্প হিসেবে ব্লাড ট্রান্সফিউশন বা বাচ্চা পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছে, ততক্ষণ তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হয় না। বাড়িতে রেখে এই জন্ডিসের চিকিৎসা সম্ভব নয়।

অবস্ট্রাকশনঃ

অবস্ট্রাকশন বা শরীরের কোথাও কোনো বাঁধা থাকলে তা থেকে যে জন্ডিস হয়, বাচ্চাদের বেলায় সেই জন্ডিস কিন্তু মারাত্মক। কারণ এটা প্রথমে হঠাৎ বোঝা যায় না। ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের সঙ্গে এই জন্ডিসের পার্থক্য নিরূপণ করা মুশকিল। কিন্তু ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস ১০ দিনের মধ্যেই সেরে যাওয়ার কথা। যদি এরকম হয়, দু’সপ্তাহের মধ্যে জন্ডিস সারছে না, তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করান।

অবস্ট্রাকশনের দরুন জন্ডিস হলে বাচ্চার পায়খানার রং সাদা হবে। তাছাড়া গায়ের রংও একটু বেশি হলুদ হতে পারে। মনে রাখবেন, এই জন্ডিস শিশুর এক থেকে দেড় মাস বয়সের মধ্যে ধরা পড়া খুব জরুরি। কারণ সে সময়ের মধ্যেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই অবস্ট্রাকশন, যার জন্য জন্ডিস হচ্ছে, তা সরিয়ে ফেলতে হবে। এটা নিয়মের ব্যতিক্রম বলেই ধরে নিতে হবে।

অন্যান্য কারণেঃ

আরো কিছু কারণে জন্ডিস হতে পারে। যেমন হাইপোথাইরয়েডের জন্যও জন্ডিস হয়। জন্মের পাঁচ থেকে সাত দিনের মাথায় এটা হয়। হাইপোথাইরয়েডের জন্ডিস দেরি করে শুরু হয়, দেরি করে শেষ হয়। আবার প্রি-ম্যাচিওর বেবি এবং ছোট সাইজের বাচ্চাদের মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

এবার জন্ডিসের ধরন। এ বি সি এ- সব ধরনের জন্ডিসই বাচ্চাদের হতে পারে। ‘এ’ আর ‘ই’ ধরনের জন্ডিস খাদ্য এবং পানীয় থেকে সংক্রমণের ফলেই সাধারণত হয়। আর হেপাটাইটিস ‘বি’ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। মায়ের তা থাকলে বাচ্চা জন্মের সময়ই ‘বি’ টাইপ জন্ডিসের সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে। তাছাড়া বাচ্চার শরীরে রক্ত দিলে হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন সংক্রমণের ফলেও এটা হতে পারে।

হেপাটাইটিস ‘বি’র আরো একটি কারণ আছে। তবে সে কারণ সম্পর্কে এখনো নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব হয়নি। আর বাড়ির বাচ্চার হেপাটাইটিস ‘বি’ হলে বাড়ির সবাইকে এর টিকা নিতে হবে। হেপাটাইটিস ‘বি’র ভ্যাকসিন বা টিকা আছে। হেপাটাইটিস ‘সি’র কিন্তু সেরকম কিছু নেই। তাই এটা খুব ভয়ের।

আবার অনেক সময় এক-দু’বছরের বাচ্চাদের জন্ডিস যে হয়েছে, তা বোঝা যায় না। ‘এ’ বা ‘ই’ টাইপ জন্ডিস হলে সেরকম ঝামেলা হয়তো হবে না। কিন্তু এরকম অজান্তে যদি বি বা সি টাইপ জন্ডিস হয়, তাহলে কিন্তু প্রাণসংশয়ও হতে পারে।

নবজাতকের জন্ডিস কী?

নবজাতক শিশু, যারা স্বাভাবিক গর্ভকাল ও ওজনসমেত সুস্থভাবে জন্ম নেয়, তাদের ২৫ থেকে ৫০ শতাংশের উচ্চরক্ত বিলিরুবিনের মাত্রা (সাত মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) বা দৃশ্যমান জন্ডিস দেখা যায়। আর অকালপ্রজ (প্রি-টার্ম) নবজাতকের ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি। কিন্তু দেখা যায়, এসব জন্ডিসের বেশির ভাগ ফিজিওলজিক্যাল বা নির্দোষ জন্ডিস।

নির্দোষ জন্ডিস নবজাতকের বেলায় ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধরা পড়ে এবং ১০-১২ দিন বয়সে এসে শিশু যদি সুস্থ স্বাভাবিক থাকে, ভালোভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করে, তবে আপনা আপনি সেরে যায়। মনে রাখা চাই, নবজাতকের জন্ডিস যদি প্রথম ২৪ ঘণ্টা বয়সে আবিভূêত হয় কিংবা তা যদি পূর্ণগর্ভকাল পাওয়া নবজাতকের ক্ষেত্রে সাত দিনের বেশি আর অকালজাত নবজাতকের ১৪ দিনের বেশি স্থায়ী থাকে, তবে অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে।

জন্মগত থাইরয়েড হরমোনবঞ্চিত শিশুর জন্ডিস হতে পারে ২৯ দিন বয়সে এসেও জন্ডিসে বিবর্ণ আহনাফের মুখমণ্ডল, বুক, পেট, হাত-পা হলুদাভ। নবজাতকের দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিসের সঠিক কারণ শারীরিক পরীক্ষা ও কিছু ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে নির্ণয় করতে হয়। অন্য কোনো লক্ষণ প্রকট না থাকলেও শুধু প্রলম্বিত জন্ডিস এ চিহ্ন নিয়ে নবজাতক শিশুর হরমোন-সংকটজনিত সমস্যা কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোনের জন্মসময় থেকে অভাবজনিত সংকট প্রকাশ পেতে পারে।

আহনাফের বেলায়ও তা-ই ঘটেছে। টি-৪-এর মাত্রা বেশ কম আর টিএইচএসের মাত্রা বেশ উঁচুতে। থাইরয়েড গ্রন্থির জন্মত্রুটিজনিত সমস্যা। তার তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু হলো থাইরয়েড হরমোন ওষুধ সেবনের মাধ্যমে। বেশি বিলম্বে চিকিৎসাবঞ্চিত না হওয়ার কারণে আমরা আহনাফের সুস্থ-স্বাভাবিক দৈহিক-মানসিক বুদ্ধি বিকাশ ও সুন্দর হাসি দেখতে পাচ্ছি।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও কত আহনাফ যথাসময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা না পেয়ে শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানবশিশুতে পরিণত হচ্ছে, কে বলতে পারে। কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডে ভোগা নবজাতকের লক্ষণ থাইরয়েড গলগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরয়েড হরমোন মানবমস্তিষ্কের বিকাশে অবশ্য প্রয়োজনীয় উপাদান। এর অভাবে শিশুর দৈহিক বাড়ন ও বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

শিশু হয় খর্বাকার ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। থাইরয়েড গ্লান্ডের জন্মগত সমস্যা নিয়ে জন্মানো নবজাতক কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নেয়। ওজন ও উচ্চতা স্বাভাবিক থাকলেও মাথার বেড় কিছুটা বাড়তি থাকে। বুকের দুধপানে সমস্যা, খসখসে ত্বক, দেহের নিস্তেজ নরম ভাব, মাথার পেছনের চাঁদি খোলা থাকা। দিনে একবার বা এরও কম পায়খানা, বৃহৎ আকৃতির জিহ্বা, কম নড়াচড়া, ফোলা, পানি জমা, মুখমণ্ডল ও নাভিতে হার্নিয়া-এসব লক্ষণ নবজাতকের কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম অসুখের বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করা হয়।

দ্রুত রোগ নির্ণয় ও তাৎক্ষণিক হরমোন ওষুধ সেবনের মাধ্যমে নির্ভর করে শিশুর মঙ্গল। আহনাফকে চিকিৎসা করানোর উদ্দেশে নিয়ে আসার দিন সূর্য ওঠা সফল হয়েছে আমাদের সবার জন্য।

হেপাটাইটিস বি – এইচআইভি/এইডসের মতোই এক ঘাতক ব্যাধিঃ

ঘাতক ব্যাধি এইচআইভি/এইডসের কথা আজ আর কারো অজানা নয়। গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার কারণে এ বিষয়ে অনেক সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে। গত নভেম্বর মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রাপ্ত সমীক্ষায় বর্তমানে পৃথিবীতে ৩৩·২ মিলিয়ন নারী-পুরুষ এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত বলে জানা যায়। এইচআইভিতে আক্রান্ত মহিলার সংখ্যা হচ্ছে ১৫·৪ মিলিয়ন আর নিষ্পাপ শিশুর সংখ্যা প্রায় ২·৫ মিলিয়ন।

২০০৭ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২·৫ মিলিয়ন নারী-পুরুষ নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয় আর এ বছর এইডসের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা হচ্ছে ২·৪ মিলিয়ন। ১৯৮১ সালে প্রথম মানব দেহে এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এ পর্যন্ত মোট ২·৫ মিলিয়ন নারী-পুরুষ এ রোগের কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। পৃথিবীতে যতো এইচআইভি/এইডসের রোগী রয়েছে তার প্রায় ৬১ শতাংশই সাব সাহারান আফ্রিকার অধিবাসী।

ব্যাপক প্রচারণার কারণে এইচআইভির ভয়াবহ চিত্র আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নিতে সক্ষম হলেও প্রয়োজনীয় প্রচারণার অভাবে এইচআইভির মতোই আর এক প্রাণসংহারী ব্যাধি ‘হেপাটাইটিস বি’ রয়ে গেছে আমাদের দৃষ্টির অগোচরে।

নীরব ঘাতক এ সংক্রামক ব্যাধিটি প্রতি মিনিটে কেড়ে নেয় দুজন নারী-পুরুষের প্রাণ। পৃথিবীতে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন অর্থাৎ দুই বিলিয়ন নারী-পুরুষই হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত। পৃথিবীর প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন নারী-পুরুষ দীর্ঘ মেয়াদের জন্য তাদের দেহে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের জীবাণু বহন করে চলছে। প্রতি বছর ১০-৩০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হচ্ছে।

হেপাটাইটিস বি ও এ রোগের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণে প্রতি বছর এক মিলিয়ন মানব সদস্য প্রাণ হারায়। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা এইচআইভি ভাইরাসের চেয়ে শতগুণ বেশি আর এ দুটো রোগ প্রায় একই উপায়ে সংক্রমিত হয়। বয়স্কদের তুলনায় শিশু ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক রোগীদের ওপর এ রোগের দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব অধিক মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়।

এইচআইভির চেয়ে এ রোগ অধিক ভয়ঙ্কর হলেও আশার বিষয় হচ্ছে এইচআইভি প্রতিরোধে অদ্যাবধি কোনো প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কৃত হয়নি, কিন্তু হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে বাজারে রয়েছে পর্যাপ্ত ও কার্যকরী টিকার ব্যবস্থা।

হেপাটাইটিস বি কি ও কতো প্রকার?

হেপাটাইটিস বি লিভার বা যকৃতের এক ধরনের প্রদাহ বা ইনফেকশন। হেপাটাইটিস বি সাধারণত স্বল্প মেয়াদি (একিউট) যার স্থায়িত্ব ছয় মাসের কম এবং দীর্ঘ মেয়াদি (ক্রমিক) যার মেয়াদকাল ছয় মাসের বেশি হয়ে থাকে। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াসহ নানা কারণে যকৃতে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে, তবে ভাইরাসজনিত কারণেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি হতে দেখা যায়। হেপাটাইটিস ভাইরাস সাধারণত ছয় ধরনের। হেপাটাইটিস বি এক ধরনের ডিএনএ ভাইরাস।

হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুকি কাদের বেশি

১। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অধিবাসী যেমন সাব সাহারান আফ্রিকা, এশিয়ার অধিকাংশ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অধিবাসী ও আলাস্কার আদি অধিবাসীদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি রোগের প্রকোপ অন্যদের তুলনায় অধিক।

২। রক্তক্ষরণ ও অন্যান্য কারণে সৃষ্ট রক্তশূন্যতার চিকিৎসায় বারবার বস্নাড ট্রান্সফিউশন গ্রহণ করা হলে।

৩। কিডনি বিকল হওয়ার কারণে ডিমোডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হলে।

৪। সমকামী পুরুষদের মধ্যে যৌন মিলনের ফলে।

৫। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত নারী-পুরুষের মধ্যে এবং একাধিক নারী-পুরুষের সঙ্গে যৌন মিলন।

৬। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক দ্রব্য সেবন।

৭। একই নিডল ও সিরিঞ্জের মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির মাদক দ্রব্য গ্রহণ।

৮। রোগীর দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ, স্যালাইন বা ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগ করার সময় কিংবা ল্যাবরেটরিতে রক্ত ও রোগীর দেহ থেকে সংগৃহীত তরল পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা করার সময় অসাবধানতাবশত হেপাটাইটিস বি সংক্রমিত রক্ত কিংবা অন্য তরল জাতীয় পদার্থ স্বাস্থ্য কর্মীদের রক্তের সংস্পর্শে এলে।

৯। হেপাটাইটিস বি রোগের প্রাদুর্ভাব অধিক- এ ধরনের এলাকায় ছয় মাসের অধিক সময় অবস্থান করা।

১০। নার্সিং হোমে দীর্ঘ সময়ের জন্য অবস্থান বা কর্মরত থাকা।

১১। হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত মায়ের গর্ভজাত সন্তানদের অনাক্রান্ত মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানদের তুলনায় হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অধিক।

হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হলে বোঝার উপায় কি?

উল্লিখিত যে কোনো উপায়ে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের জীবাণু দেহে অনুপ্রবেশ করার পর রোগের লক্ষণ দেখা দিতে এক থেকে দুমাস সময় লাগতে পারে। আর এ সময়কে বলা হয় ইনকিউবেশন পিরিয়ড। স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রদাহের ওপর ভিত্তি করে রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ ভিন্ন ধরনের হতে পারে। শিশু ও যুব বয়সের ছেলেমেয়েরা একিউট হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হলে তাদের মধ্যে এ রোগের লক্ষণ তেমন একটা দেখা যায় না।

আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য লক্ষণ থেকে শুরু হয়ে লিভার অকেজো ও মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে। যেসব লক্ষণ দেখে হেপাটাইটিস বি-এর সংক্রমণ বোঝা যায় তার মধ্যে রয়েছে গা মেজ মেজ করা, অবসাদ অনুভব করা, মাথা ব্যথা, গা চুলকানো, গেটে ব্যথা বিশেষ করে ডান দিকের উপরিভাগে, ক্ষুধামন্দা, বমিভাব থেকে শুরু করে বমি হওয়া, জ্বর অনুভূত হওয়া, চোখ ও প্রস্রাবের রঙ হলুদ হওয়া, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা অনুভব করা ইত্যাদি। 

লিভারের দীর্ঘ মেয়াদি প্রদাহের কারণে শারীরিক দুর্বলতা ও অবসাদগ্রস্ততা ছাড়া আর কোনো লক্ষণ দেখা নাও যেতে পারে। তবে দীর্ঘ দিনের প্রদাহের কারণে কারো কারো বেলায় লিভার অকার্যকর হয়ে কিংবা সিরোসিসের মতো জটিল উপসর্গের কারণে নানা লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আর এ অবস্থাকে এন্ড স্টেজ লিভার ডিজিজ বলা হয়।

হেপাটাইটিস বি নিরূপণের উপায় কি?

রোগের লক্ষণ প্রাথমিকভাবে বলে দেবে আপনি সম্ভবত হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে বি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে রক্ত পরীক্ষাই হচ্ছে নির্ভরযোগ্য ও নিশ্চিত উপায়। রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস বি আইজিএম কোর অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস বি ই এন্টিজেন ও সেই সঙ্গে লিভার এনজাইমের অধিক মাত্রা নিশ্চিতভাবে হেপাটাইটিস বি-এর একিউট সংক্রমণের কথা বলে দেবে।

ক্রনিক বা দীর্ঘ মেয়াদি হেপাটাইটিস বি নিশ্চিত হওয়ার জন্য রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেনের দীর্ঘ মেয়াদি উপস্থিতি, হেপাটাইটিস বি কোর আইজিজি (ওমএ) অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস ই এন্টিজেন ও লিভার এনজাইম পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

আর সময়ের ব্যবধানে বি ভাইরাস আপনার দেহ থেকে নিঃসৃত হয়ে গেলে রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেনের মাত্রা হ্রাস পেয়ে এক সময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে এবং ভবিষ্যতের জন্য হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধক হেপাটাইটিস বি কোর এন্টিবডি ও বি সারফেস অ্যান্টিবডি তৈরি করবে।

হেপাটাইটিস বি-এর দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব কি?

হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশই কোনো প্রকার চিকিৎসা ব্যতিরেকেই আরোগ্য লাভ করে থাকে। পাচ বছর বয়সের আগে আক্রান্ত শিশুদের শতকরা ৯০ জনই লিভারের ক্রনিক বা দীর্ঘ মেয়াদি প্রদাহে ভুগতে থাকে। বয়স্কদের মধ্যে এ সংখ্যা হচ্ছে পাচ থেকে দশ ভাগ। ক্রনিক প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা একজন প্রতি বছর চিকিৎসা ছাড়াই জীবাণু বিমুক্ত হয় আর শতকরা ৩০ জন লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক জটিলতায় ভুগতে থাকে।

ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা পাচ থেকে দশজন লিভার ক্যান্সার বা হেপাটোসেলুলার কারসিনোমায় আক্রান্ত হয়।

হেপাটাইটিস বি রোগের কোনো চিকিৎসা আছে কি?

হেপাটাইটিস বি রোগের সফল চিকিৎসার জন্য খুব বেশি কার্যকরী ওষুধ না থাকলেও ইনটারফেরন, লেমিবুডিন, এডিফোবির, এন্টিকাবির ও টেলিবিবুডিন জাতীয় ওষুধ এফডিএ কর্তৃক অনুমোদিত। এ ধরনের ওষুধ সাধারণত চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা প্রয়োজন হয় আর এসব ওষুধ হেপাটাইটিস বি-এর চিকিৎসায় শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে কার্যকরী। দীর্ঘ মেয়াদি ইনফেকশনের কারণে লিভার অকার্যকর হয়ে গেলে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়ে।

হেপাটাইটিস বি থেকে বাচার উপায় কি?

যেহেতু এ রোগের তেমন কার্যকরী ও সফল চিকিৎসা নেই, সেহেতু প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই এ ধরনের প্রাণসংহারী ব্যাধি থেকে বাচার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বিরুদ্ধে দেহে প্রতিষেধক এন্টিবডি তৈরি করার লক্ষ্যে তিনটি প্রতিষেধক টিকা নেয়া প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় শিশু জন্মের দুই থেকে তিন দিনের মাথায় হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেয়া হয়। দ্বিতীয় ডোজ এক থেকে দুমাসের মধ্যে আর তৃতীয় ডোজটি প্রথম ডোজের ছয় মাসের মাথায় দেয়া প্রয়োজন হয়।

গ্ল্যাক্সোর তৈরি টুইন রিকস ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজটির সাত দিন পর দ্বিতীয় ডোজ, ২১ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তৃতীয় ডোজ এবং এক বছর পর একটি বুস্টার ডোজ দিয়ে ভ্যাকসিনেশন সিরিজ সমাপ্ত করা যায়। স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির জন্য কোনো প্রকার বুস্টার ডোজ নেয়ার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কোনো কারণে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে গেলে বুস্টার ডোজ নেয়া প্রয়োজন হতে পারে।

 প্রতিষেধক টিকা ছাড়াও এইচআইভি/এইডস, হেপাটাইটিস বি ও সি-এর মতো মরণব্যাধিসহ সিফিলিস ও গনোরিয়া জাতীয় যৌন ব্যাধির হাত থেকে বাঁচতে হলে ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিচর্যা ও ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে চলার মাধ্যমে সুস্থ, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন অতীব প্রয়োজন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url